আলুর দোষ
#আলুর দোষ
আলুর প্রতি, শুভঙ্কর বাবুর ভালোবাসা, প্রেম, প্রীতি, মোহ, মায়া আরও যতো কিছু আছে, সব মিলিয়ে আকর্ষণ প্রায় মহাকাব্যিক পর্যায়ের। ছোটোবেলায়, স্কুলের তাড়াহুড়োয়, গরম ভাত, ঘি আর সাথে এক খাবলা আলু সিদ্ধ, সেই যে ভালোবাসার শুরু, এই সেইদিন পর্যন্ত তা ছিলো অটুট। নাহলে কেউ হায়দ্রাবাদ ভ্রমণে গিয়ে, শুধুমাত্র আলুর অভাবে, বিরিয়ানি না খেয়ে ফিরে আসে। জিজ্ঞেস করলে বলেন,"ছোঃ,ওটা আবার বিরিয়ানি হলো, ভাতে মশলা মাখিয়ে, ভাপিয়ে দিলেই কি হয়? আসল জিনিস টাই তো নেই। আসিস খেতে কোনোদিন আমাদের ওখানে। নরম, তুলতুলে, ধোঁয়া ওঠা কি জিনিস ভরা থাকে ভিতরে, দেখবি"।
এহেন, শুভঙ্কর বাবুর আলু স্পর্শ করা এখন পুরোপুরি বারণ। রক্তে শর্করা ক্রমশঃ উর্ধমুখী, বংশে বাবা, দাদার এই রোগ কোনও কালে ছিলো না, মায়ের দিকেও কেউ কোনও দিন ছিলো, বলে তাঁর মনে পড়ে না। শরীরের এই পরিবর্তনে, তিনি যে খুব একটা চিন্তিত সেটা নয়, সবচেয়ে বড় এবং অনৈতিক কথা হলো, তাঁর আলু খাওয়ার উপরে সম্পূর্ণরূপে নিষেধাজ্ঞা। এই বয়সে , শরীর একটু আধটু জবাব দেবেই, অঙ্গ প্রতঙ্গ গুলো বেসুরে বাজতেই থাকবে, তাই বলে ভালোবাসার বস্তুর সাথে একেবারে ছাড়াছাড়ি। ডাক্তার যদিও বা বলেছিলেন, একটু বুঝে শুনে খাবেন, ঘরের নাপাশ ডাক্তার তৎক্ষণাৎ ফরমান জারি করে রান্নাঘর থেকে আলু বিদায় করলেন।
রক্তের রিপোর্ট আসতেই, ঝামটিয়ে উঠেছিলেন ছন্দা, "বংশে যদি কারুর নাই থাকবে, এই পঁয়ষট্টি তে, তোমারই বা ধরা পড়বে কেনো? সব তোমার মায়ের দোষ, ছোটো থেকে খাবলা, খাবলা আলু সেদ্ধ খায়িয়ে এসেছেন, এখন বোঝো, কোলের খোকাটিকে আমাকে দিয়ে, উনি তো দশ বছর স্বর্গবাসী হয়েছেন। এই বার থেকে, ওঠো রাত্রে বেলায় পাঁচবার করে"।
বাজার করে এই যাবৎ আর সুখ পান না, শুভঙ্কর বাবু। টিভির খবরে, কাগজে কতো কি লেখে আজকাল, কোল্ডস্টোরে কতো টন আলু পচে গিয়েছে, চন্দ্রমুখীর দাম নাকি প্রায় বত্রিশের কাছাকাছি, জ্যোতি তো বাজারে অমিল বললেই চলে। দীর্ঘশ্বাস টা ভিতরে টেনে, হাতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে যান তিনি। এখনও অভ্যাসবসে অন্য সব্জি কেনার মাঝে জিজ্ঞেস করেই ফেলেন "মালতী আলু কতো করে দিচ্ছো?" আগে পাঁচ কিলোর কমে না কেনা শুভঙ্কর বাবু, এখন শুধু ধরেই দেখেন, কোথাও কোনও পচা ধ্বসা আছে নাকি। মাছের ঝোল, সব্জিপত্র গুলোও কেমন পানসিপানা লাগে, আলু না দিলে কি ওইসব রান্না ভালো হয়? ফোঁস করে আবার একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
রান্নার মেয়ে টাও যথেষ্ট পাজী, কোনও রান্নাতেই আজকাল আর সেইরকম স্বাদ পান না তিনি। না পাওয়া টাই স্বাভাবিক। সপ্তাহ দুয়েক আগে একবার বলেই ফেলে ছিলেন, "কি সব হাবিজাবি রাঁধিস, গার্গেল করা গরম জলের মতোন লাগে "। কালকেউটের লেজে পা পড়েছিলো, ছন্দা কে চেঁচিয়ে বলে, "মাসি, পরের মাস থেকে নতুন রান্নার মেয়ে খুঁজো, আমার দ্বারা হবে না আগে থেকেই বলে দিচ্ছি "। দুদিন আগে নাকি ছন্দা কে এও বলেছে, নিজের কানে শুনেছেন তিনি, "মালতী খুব ঢলানী মেয়েছেলে, এই বয়সে মেসোকে একটু চোখেচোখে রেখো মাসি। প্রতিদিন বাজারে গিয়ে আলুর দাম জিজ্ঞেস করে"। একদম মন থেকে বেনারসে গিয়ে, গঙ্গা সান্নিধ্যে বসবাসের ইচ্ছে জাগে, স্বামী হারিয়ে সব বেনারসে শিবের আশ্রয়ে থাকতে পারলে, তিনিও বা পারবেন না কেনো। মন থেকে তিনিও তো এখন বিপ্রেমিকা।
খুব একটা বেশি কথা আজকাল আর ঘরে বলেন না, রাত্রে ছেলের ফোন আসলে ওই একটু হুঁ হাঁ, বেশির ভাগই ওর মায়ের সাথে ফোনে কথা হয়। পরের সপ্তাহে নাকি সবসুদ্ধু এসে, ফেরার পথে তাদের কেও নিয়ে কলকাতা ফিরবে। কি এক বড় সুগার স্পেশালিটি না ছাই হাসপাতাল হয়েছে কলকাতায়, সব বাইরে থেকে নাম করা অবাঙালী ডাক্তার আসে, দেখেই নাকি ভক্তি শ্রদ্ধা বেড়ে যায়, শুনে অবশ্য কান চুলকেছিলেন তিনি। হয়েছে তো একটু শর্করা বৃদ্ধি, তাতেই মা আর ছেলের বাড়াবাড়ির অন্ত নেই। হিন্দি টা অবশ্য ভালো বলতে পারেন না, তবে সুযোগ যখন একবার পেয়েছেন, একে বারে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের সুপার স্পেশাল ডাক্তার কে দিয়ে লিখিয়েই ছাড়বেন যে একটা দুটো আলু নিশ্চিন্তে খেতে পারেন। অনেক হয়েছে আর কিছুতেই এই বঞ্চনা সহ্য করবেন না।
ঘোর অনলাইন এর যুগে, ডাক্তারের ঘরের বাইরে এক ঘন্টা লাইনে বসে আছেন তিনি। অবশ্য তাতে তার কোনও অসুবিধা নেই, বরঞ্চ মন টা আজ বেশ ফুরফুরে। একটা হেস্তনেস্ত আজ করেই ফিরবেন। ছেলে ফোনে তার মাকে রিপোর্ট দিচ্ছে এখনও ডাক্তার বাবু ডাকেন নি তাদের কে, কতো বড় আর ব্যস্ত ডাক্তার সেটাও বোঝানো।
অবশেষে ডাক পড়লে, শুভঙ্কর বাবু হিন্দিতে নমস্তে বলে শুরু করতে যাবেন, ওমা অল্পবয়সী ডাক্তারবাবুটি শুনি ভাঙা বাংলায় উনাকে জিজ্ঞেস করেন, কেমন আছেন। ছেলের বয়সী, ডাক্তারবাবুর মুখের ভাঙা বাংলা অনেক দিন পর শুভঙ্কর বাবুর মনভাঙা মুখে একটা বেশ গ্লো নিয়ে এলো। সব রিপোর্ট দেখে ডাক্তার বাবু যখন বললেন, আপনি তো বেশ ভালো আছেন, বেশি কিছু হয় নাই আপনার, তখন আর শুভঙ্কর বাবুকে, কে পায়? আমতা আমতা করে, মনের কথাটা বলেই ফেললেন।
তাঁর কথায় ডাক্তারবাবুর মুখে হাসি আর থামেই না, যেনো কোনও বাচ্চা ছেলের আব্দার রাখার ইচ্ছা। ভাঙা বাংলায়, শুভঙ্কর বাবু কে আশ্বস্ত করলেন "ঠিক আছে, ঠিক আছে আমি আপনার ছেলে কে বলিয়া দিচ্ছি, যে আপনার আলুতে কোনও দোষ নাই, বেফিকার হয়ে একটা, আধটা নিতে পারবেন"।
আমার আলুতে কোনও দোষ নেই, মানে? তরাক করে, চেয়ার ছেড়ে, স্প্রিং দেয়া কলের পুতুলের মতোন উঠে দাঁড়ান তিনি। ছিঃ, ছিঃ, ছিঃ, কান লাল হয়ে উঠে তাঁর। ভাবতেও পারেন না, ভাষার এমন বিপর্যয় ও যে কখনো কখনো, জীবনে কঠিন বিপর্যয় ডেকে আনে, তাও আবার নিজের ছেলের সম্মুখে। সেইদিন থেকে হাসি মুখে আর কোনও দিন আলু চাখেন নি শুভঙ্কর বাবু ।।
পুনশ্চ: আমার নয়, স্বয়ং গুরু গুগলের উক্তি
"মহিলাদের প্রতি পুরুষের মাত্রাতিরিক্ত ও অশোভন আসক্তি কে সাধারণত, চলিত বাংলায় আলুর দোষ বলা হয়ে থাকে।"
বেচারা আলু, সতেরশো শতকে পর্তুগীজ নাবিকদের হাত ধরে, জাহাজে ভাসতে ভাসতে ভারতে আগত, বাঙালির সব খাবারে অণুঘটকের মতো যোগদান করে, রসনায় আস্বাদ এনে দেয় কিন্তু চরিত্রে তার যতো বিড়ম্বনা ।।
Comments
Post a Comment