শনিবারের কাহিনী
--- প্রসূন
" ঘটনাটা হয়তো, ১৯৩৮ - ৩৯ সালের হবে। বুঝলে, গল্পটা আমার দাদা-শ্বশুরের মুখে শোনা। ওহো,হো , তোমরা তো, আবার দাদা-শ্বশুর, বস্তুটি কি, ঠিক বুঝলে না?" - শিভ্যাসের গ্লাসটা তুলে যুৎকরে, সোফায় বসলেন দেবাশীষ দা। সতেরো বছরের বেশি, ওয়েস্ট কোস্ট প্রবাসী, মাইক্রোসফটে কাজ করেন। সাগর পারের, বাঙালীদের এ এক বিচিত্র অভ্যেস, প্রতি শনিবারে, বাঙালি আড্ডায় না বসলে, নাকি কালচার টা ঠিক ঠাক মেইনটেইন হয় না, ছেলে-মেয়ে গুলো সব বাংলা শিখতে পারে না। কত কি আছে আমাদের গর্ব করার মতো, রবীন্দ্রনাথ, শান্তিনিকেতন, দুর্গাপুজো, লিটারেচার, কার্ল মার্ক্স্, ফুটবল, গান, কবিতা, মাছ-মিষ্টি, PNPC, বাঙালি কাঁকড়া। আরো কত কি।
"কেনো বুঝবো না। বৌদির দাদু তো?" - সাত মাসের বাচ্চাটাকে প্র্যামে শুইয়ে, স্মিত হেসে বললো তিয়াশা। অয়নের স্ত্রী, প্রথম সন্তান তাই একটু বেশিই কেয়ারিং।
"হ্যাঁ , গল্পটা অবশ্য শুনেছি , অষ্টমঙ্গলা করতে গিয়ে । প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি যাওয়া, কচি বয়স তখন, তোমাদের বৌদিও তন্বী কটি, শ্যালিকা সবে ইংলিশ অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়েছে, শ্বশুর মশাই বাজারের থলে নামানোর আর শ্বাশুড়ী রান্নাঘর থেকে বেরোনোর সময়ই পাচ্ছেন না। চারপাশে একটা, মাখো মাখো অবস্থা, বুঝলে কিনা ব্রাদার ?"
"কি গো, আরো এক প্লেট স্যামন দেবো নাকি, তোমাদের? এইবার কিন্তু নো ফ্রাই, অনলি বেকড ।" - কুক এরিয়া থেকে জিজ্ঞেস করলেন বৌদি। আমার বৌ আর তমালের স্ত্রী টেবিলে খাবার সাজাতে ব্যাস্ত। কনসেপ্টটা মন্দ নয়, শুধু নামটাই যা আমার অপছন্দের, "পটলাক"। কত ভালো ভালো নাম আছে বাংলায়, দেওয়া যেতো না "সাথে ভোজন" বা এইরকম অন্যকিছু।
"বুড়োর তখন আশির উপর বয়স, বৌ মরেছে, কম করে পাঁচ বছর। কিন্তু রসিক নাগর। প্রণাম করতে গেলুম তো বলে - আরে ভাই, গলায় আয়।"
"যাহঃ ! টু থাউসেন্ড ওয়ানে, তখন দাদুর আশি ও হয় নি। আমাদের বিয়ের সময়, বাপি বাহান্ন, আর দাদু আটাত্তর বা ঊনআশি।" - ডিস্পোজাবল প্লেটগুলো টেবিলে রাখতে রাখতে, মৃদু প্রতিবাদ করে উঠলেন বৌদি ।
"আমার শ্বশুরবাড়ি আবার, চিরটাকাল ই ম্যাট্রিয়ার্ক। দিদি-শ্বাশুড়ি রাজ করতেন। বৌ মারা যাওয়ার পরে, বুড়ো একেবারে, অচিন পাখি। "
"আমার ঠাকুরমা, খুব সুন্দর কীর্ত্তন গাইতেন আর অসাধারণ সুন্দরী ছিলেন। মহিষাদলের রাজবাড়িতে, রাজ-জ্যোতিষী ছিলেন, আমার ঠাকুরমা র বাবা। আসল বাড়ি অবশ্য নবদ্বীপ। শেষ বয়সে ফিরে ও এসেছিলেন নবদ্বীপে। এমনকি আমার ঠাকুরমা র বিয়েও হয়েছিলো নবদ্বীপ থেকে।" - বৌদি ট্রাম্প করলেন দেবাশীষ দা কে।
"সন্ধ্যায়, প্রথমে ঠিক করেছিলাম, বৌ আর শ্যালিকা কে, নিয়ে মুভি দেখতে যাবো। কিন্তু বাগড়া দিলো ওয়েদার । একদম সিয়াটেলের মতনই, আনপ্রেডিক্টবল। না বলে বৃষ্টি, তা ও আবার শীতের সন্ধ্যায়। অগত্যা কি আর করা যাবে? শ্যালিকা ই বুদ্ধি দিলো, বললো চলোনা দেবাশীষ দা! দাদুর কাছে গিয়ে গল্প শুনি।"
"বুড়ো তখন, নিজের ঘরে বসে, নিউজ পেপারে মগ্ন । কি করছেন, জিজ্ঞেস করতেই,সঙ্গে সঙ্গে পশ্চাৎ জ্বালানো হাসি সহ উত্তর - আর বলিস না ভাই! দেখছি, একটা দুটো বুড়ী, এইদিক ঐদিক কোথাও ফাঁকা পরে আছে নাকি? "
"উফঃ, কখন থেকে বুড়ো, বুড়ো, করে চলেছো তুমি, দেবাশীষ! এইটা কিন্তু ঠিক নয় আর বাচ্চাদের সামনে তো একেবারেই নয়। দাদু তোমাকে খুব ভালোবাসতো ।" - বৌদি দেবাশীষ দা কে টুকে দিলেন, বাচ্চাদেরকে খাবার সার্ভ করার মাঝে।
"যাই হোক ব্যাক টু স্টোরি, বুঝলে রিকোয়েস্ট করেই ফেললাম - যে দাদু একটা গল্প শোনান না, যা বৃষ্টি হচ্ছে, বাইরে যাওয়ার প্ল্যান তো ভণ্ডল।"
" উইথ অনলি ওয়ান কন্ডিশন, এর পরের বার যখন আসবে, আমার জন্য এক প্যাকেট মার্লবোরো নিয়ে আস্তে হবে।"
"দাদু।।।।" চিৎকার করে উঠলো শ্যালিকা। "বলবো বাপি কে?"
"ঠিক আছে, আমার মনে থাকবে। আপনি শুরু করুন।" - আমি চোখ টিপে বললাম উনাকে ।
"বুঝলি ভাই, শ্বশুর বাড়ি ভালো হলে, তার একটা আলাদা মজা আছে। " - দেবাশীষ দা র স্বগতোক্তি
আমাদের শ্যিভাস, দ্বিতীয় পর্বে পড়লো। তমাল তো রীতিমতো কুশন টা, পেটের উপর নিয়ে আধশোয়া অবস্থায়। মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম, মহিলারা ও সব বসে পড়েছে, শুধু তিয়াশা ছাড়া। বাচ্চা টা মনে হয় এখনো ঘুমায় নি।
"দাদু নবদ্বীপ যেতেন? ফ্রেকুয়েন্টলি না মাঝে মাঝে ?"
"পাগল হলি ভাই! একে জাঁদরেল শ্বশুর তারপর আবার তর্কালঙ্কার। বিজয়া, জামাই ষষ্ঠী আর রাসের সময় ছাড়া, ওদিক মারাতাম না। তোর ঠাকুরমা রা ছিলেন পাঁচ বোন আর এক ভাই। সবচেয়ে কনিষ্ঠ রত্নটি পড়েছিল, আমার ভাগ্যে। শালাবাবু টি ছিলেন আরো এক রত্ন, ভাগ্যিস ব্রিটিশরা, দেশ ছাড়ার সময় ওইটাকে সাথে করে নিয়ে যায় নি।"
"সালটা মনে হয় তেরোশো ছেচল্লিশ, সাতচল্লিশ হবে। ইংরেজি টা, মনে নেই ভাই, তবে তখনও দেশ স্বাধীন হয় নি। বছর দুয়েক হলো বিয়ে হয়েছে। একদিন খুব ভোরবেলায় খবর পেলাম, শ্বশুর মশায় নাকি রাত্রিবেলায়, গত হয়েছেন। শিরোরন্ধ্র ফেটে প্রাণবায়ু বেরিয়ে গিয়েছে। শিরোরন্ধ্র মানে, গোদা বাংলায় যাকে, ব্রহ্মতালু বলে। তখন কি আর, ব্রহ্মতালু, টালু বুঝি। পরে জানলাম যে, জ্ঞানী গুণী লোকেদের হয়, ঐসব। মহাভারতে নাকি, পিতামহ ভীষ্ম, আঠারো দিন, শরসজ্জার পরে, শিরোরন্ধ্র ফেটে মারা গিয়েছিলেন।"
" কি আর করি, ক্রন্দনরত তোমার ঠাকুরমাকে, বগলদাবা করে, চল্লাম নবদ্বীপ। গিয়ে তো দেখি ভাই, হুলুস্থুলু কান্ড ! একে তর্কালঙ্কার , তাপ্পরে ব্রহ্মতালু! চারপাশে সব বাগিশ আর ন্যায়রত্নদের ভীড়ে, আমি কোথায় যাই? সবাই মিলে, নিধান দিলেন যে এই মৃত্যু, মহামানবদের হয়। উঁনাকে বাড়ির মধ্যে সমাধিস্থ করা হোক, দাহ করা চলবে না। কিন্তু ঐযে বললাম, আমার শ্যালক মহাশয়টি আরো বড়ো রত্ন। তিনি দেখলেন, যে বাড়ির মধ্যে সমাধি দিলেই আবার খরচ। ওই আরকি, যা হয়, প্রতিদিন ধূপ-ধুনো, ভোগ দাও, হয়তো কিছুদিন পরে লোকে বলবে,একটা সমাধি মন্দির বানাও, তর্কালঙ্কার বলে কথা। অবশেষে, শ্যালক বাবুর, নিধান মেনেই সবাই চল্লাম, নবদ্বীপ শ্মশানে, দাহ করনের জন্য। "
শাশুড়ি যে কখন, সিঙ্গাড়া ভেজে নিয়ে এসেছেন, গল্প শোনার নেশাই, বুঝতেই পারিনি। চমক ভাঙলো শাশুড়ির কথায় - "বাবা, আপনি কিন্তু একটার বেশি খাবেন না। ভিতরে মাংসের পূর আছে।"
"তারপর কি হলো দাদু?" - মাংসের সিঙ্গাড়ায় এক কামড় দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। দেখি কখন তোমাদের বৌদিও এসে বসে পড়েছে, আমার শ্যালিকার পাশে।
"অর্ধেক দিনের বাসি মরা, তারউপর হাজার নিধান-বিধানের গন্ডি পেরিয়ে, পৌঁছাতে পৌঁছাতেই সন্ধ্যে। আর সন্ধ্যে বেলায়, ডোম পাওয়া যে, কত ঝক্কির, সে তুমি তর্কালঙ্কার ই হও বা অন্য কেউ? ঝিল্লি সাজিয়ে, মরা তুলতেই আরো ঘন্টা তিনেক কাবার। পাশের ঝিল্লি তে, আরো একজন পুড়ছে, বিশ্বাস করবি না ভাই, হঠাৎ করে, কোথা থেকে, সে এক খন্ড কালো মেঘ আর তার সাথে পাগলা ঝঞ্ঝা। পাশের ঝিল্লির লোক তখনো জল দেয় নি, আর আমাদেরটা তো শুরুই হয় নি। মিনিট খানেক পরে থেকে শুরু হলো, শিলাবৃষ্টি।"
"ডোমগুলো তো সব, পালালো। আমি আর শালাবাবু বসে আছি। কিন্তু আর সহ্য করা যাচ্ছিলো না। এইবার না গেলে, আমাদের কেও ঝিল্লিতে তোলার লোক খুঁজতে হবে। শালবাবু কে বললাম - দাদা, ডোমেদের আস্তানা তে গিয়ে দাঁড়ায়, নাহলে এইবার আমরাও মারা পড়বো। "
"শিলা বৃষ্টি, থামতেই, পড়ি কি মরি, দিলাম ছুট। ডোমদের আস্তানা থেকে, ঝিল্লিটা মিনিট দুয়েকের পথ হবে। এসে তো থ !! দেখি, আমাদের ঝিল্লি খালি, পাশের টাও , নিভে গিয়েছে, কিন্তু আধ পোড়া শব তখনো ঝিল্লির উপর। রাত্রির অন্ধকারে, শুরু হলো খোঁজা। সেকি সম্ভব ! বৃষ্টির মধ্যেই, চারপাশের, ঝোপ-ঝাড়, জঙ্গল সব তন্ন তন্ন করে খোঁজা হলো।কোথাও পাওয়া গেলো না। মাঝে মধ্যে, ভয় হচ্ছে, শেষে শিয়াল কুকুরে, নিয়ে গেলো নাতো তর্কালঙ্কার মশাইকে ? গোটা রাত্রি খুঁজেও, কোথাও পেলাম না।"
চমকে উঠলাম, দেখি পিঠে তোমাদের বৌদির হাত। অন্য সময় হলে হয়তো, ভালোই লাগতো। সত্যি কথা, গা টা একটু শিরশিরিয়ে উঠছিলো।
"তাহলে, শেষ পর্যন্ত্য আপনার শ্বশুর মশায়ের ডেডবডিটার কি হলো?"
" রহস্য বাবা, সারা জীবনে এর উত্তর খুঁজে পেলাম না। নিজের চোখের সামনে দেখা, অন্য কেউ বললে হয়তো বিশ্বাস করতাম না, কিন্তু নিজের চোখকে অবিশ্বাস করি কি করে? তারপরের দিন থেকে হপ্তা খানেক ধরে , গঙ্গার নীচে পর্যন্ত জাল ফেলে, আশপাশের অনেক দূর পর্যন্ত্য খোঁজা হয়েছিল। তর্কালঙ্কার মশায় আর ধরা দিলেন না। হয়তো গঙ্গা বক্ষে, নিজের সমাধি নিজেই করে নিলেন।"
"এই, তোমরা খাবে না? -- ওহো বৌদি আপনি?" চমকে বলে উঠলো তিয়াশা। বাচ্চা কে ঘুম পাড়িয়ে, কখন এসে জয়েন করেছে,আমরা কেউ খেয়ালও করি নি।
এখনো বৃষ্টি পড়ছে। সত্যি, আনপ্রেডিক্টেবল সিয়াটেল ওয়েদার। আমার গায়ের রোম গুলোও যে কাঁটা দেয় নি, বলবো না। শুধু ভাবছি, এই অবস্থায়, খাওয়ার পর, ঘুমন্ত ছেলে আর আমার চেয়েও বেশি ভয় পাওয়া বৌ কে নিয়ে, পাঁচ মাইলের ড্রাইভ।।।
"কি গো, আরো এক প্লেট স্যামন দেবো নাকি, তোমাদের? এইবার কিন্তু নো ফ্রাই, অনলি বেকড ।" - কুক এরিয়া থেকে জিজ্ঞেস করলেন বৌদি। আমার বৌ আর তমালের স্ত্রী টেবিলে খাবার সাজাতে ব্যাস্ত। কনসেপ্টটা মন্দ নয়, শুধু নামটাই যা আমার অপছন্দের, "পটলাক"। কত ভালো ভালো নাম আছে বাংলায়, দেওয়া যেতো না "সাথে ভোজন" বা এইরকম অন্যকিছু।
"বুড়োর তখন আশির উপর বয়স, বৌ মরেছে, কম করে পাঁচ বছর। কিন্তু রসিক নাগর। প্রণাম করতে গেলুম তো বলে - আরে ভাই, গলায় আয়।"
"যাহঃ ! টু থাউসেন্ড ওয়ানে, তখন দাদুর আশি ও হয় নি। আমাদের বিয়ের সময়, বাপি বাহান্ন, আর দাদু আটাত্তর বা ঊনআশি।" - ডিস্পোজাবল প্লেটগুলো টেবিলে রাখতে রাখতে, মৃদু প্রতিবাদ করে উঠলেন বৌদি ।
"আমার শ্বশুরবাড়ি আবার, চিরটাকাল ই ম্যাট্রিয়ার্ক। দিদি-শ্বাশুড়ি রাজ করতেন। বৌ মারা যাওয়ার পরে, বুড়ো একেবারে, অচিন পাখি। "
"আমার ঠাকুরমা, খুব সুন্দর কীর্ত্তন গাইতেন আর অসাধারণ সুন্দরী ছিলেন। মহিষাদলের রাজবাড়িতে, রাজ-জ্যোতিষী ছিলেন, আমার ঠাকুরমা র বাবা। আসল বাড়ি অবশ্য নবদ্বীপ। শেষ বয়সে ফিরে ও এসেছিলেন নবদ্বীপে। এমনকি আমার ঠাকুরমা র বিয়েও হয়েছিলো নবদ্বীপ থেকে।" - বৌদি ট্রাম্প করলেন দেবাশীষ দা কে।
"সন্ধ্যায়, প্রথমে ঠিক করেছিলাম, বৌ আর শ্যালিকা কে, নিয়ে মুভি দেখতে যাবো। কিন্তু বাগড়া দিলো ওয়েদার । একদম সিয়াটেলের মতনই, আনপ্রেডিক্টবল। না বলে বৃষ্টি, তা ও আবার শীতের সন্ধ্যায়। অগত্যা কি আর করা যাবে? শ্যালিকা ই বুদ্ধি দিলো, বললো চলোনা দেবাশীষ দা! দাদুর কাছে গিয়ে গল্প শুনি।"
"বুড়ো তখন, নিজের ঘরে বসে, নিউজ পেপারে মগ্ন । কি করছেন, জিজ্ঞেস করতেই,সঙ্গে সঙ্গে পশ্চাৎ জ্বালানো হাসি সহ উত্তর - আর বলিস না ভাই! দেখছি, একটা দুটো বুড়ী, এইদিক ঐদিক কোথাও ফাঁকা পরে আছে নাকি? "
"উফঃ, কখন থেকে বুড়ো, বুড়ো, করে চলেছো তুমি, দেবাশীষ! এইটা কিন্তু ঠিক নয় আর বাচ্চাদের সামনে তো একেবারেই নয়। দাদু তোমাকে খুব ভালোবাসতো ।" - বৌদি দেবাশীষ দা কে টুকে দিলেন, বাচ্চাদেরকে খাবার সার্ভ করার মাঝে।
"যাই হোক ব্যাক টু স্টোরি, বুঝলে রিকোয়েস্ট করেই ফেললাম - যে দাদু একটা গল্প শোনান না, যা বৃষ্টি হচ্ছে, বাইরে যাওয়ার প্ল্যান তো ভণ্ডল।"
" উইথ অনলি ওয়ান কন্ডিশন, এর পরের বার যখন আসবে, আমার জন্য এক প্যাকেট মার্লবোরো নিয়ে আস্তে হবে।"
"দাদু।।।।" চিৎকার করে উঠলো শ্যালিকা। "বলবো বাপি কে?"
"ঠিক আছে, আমার মনে থাকবে। আপনি শুরু করুন।" - আমি চোখ টিপে বললাম উনাকে ।
"বুঝলি ভাই, শ্বশুর বাড়ি ভালো হলে, তার একটা আলাদা মজা আছে। " - দেবাশীষ দা র স্বগতোক্তি
আমাদের শ্যিভাস, দ্বিতীয় পর্বে পড়লো। তমাল তো রীতিমতো কুশন টা, পেটের উপর নিয়ে আধশোয়া অবস্থায়। মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম, মহিলারা ও সব বসে পড়েছে, শুধু তিয়াশা ছাড়া। বাচ্চা টা মনে হয় এখনো ঘুমায় নি।
"দাদু নবদ্বীপ যেতেন? ফ্রেকুয়েন্টলি না মাঝে মাঝে ?"
"পাগল হলি ভাই! একে জাঁদরেল শ্বশুর তারপর আবার তর্কালঙ্কার। বিজয়া, জামাই ষষ্ঠী আর রাসের সময় ছাড়া, ওদিক মারাতাম না। তোর ঠাকুরমা রা ছিলেন পাঁচ বোন আর এক ভাই। সবচেয়ে কনিষ্ঠ রত্নটি পড়েছিল, আমার ভাগ্যে। শালাবাবু টি ছিলেন আরো এক রত্ন, ভাগ্যিস ব্রিটিশরা, দেশ ছাড়ার সময় ওইটাকে সাথে করে নিয়ে যায় নি।"
"সালটা মনে হয় তেরোশো ছেচল্লিশ, সাতচল্লিশ হবে। ইংরেজি টা, মনে নেই ভাই, তবে তখনও দেশ স্বাধীন হয় নি। বছর দুয়েক হলো বিয়ে হয়েছে। একদিন খুব ভোরবেলায় খবর পেলাম, শ্বশুর মশায় নাকি রাত্রিবেলায়, গত হয়েছেন। শিরোরন্ধ্র ফেটে প্রাণবায়ু বেরিয়ে গিয়েছে। শিরোরন্ধ্র মানে, গোদা বাংলায় যাকে, ব্রহ্মতালু বলে। তখন কি আর, ব্রহ্মতালু, টালু বুঝি। পরে জানলাম যে, জ্ঞানী গুণী লোকেদের হয়, ঐসব। মহাভারতে নাকি, পিতামহ ভীষ্ম, আঠারো দিন, শরসজ্জার পরে, শিরোরন্ধ্র ফেটে মারা গিয়েছিলেন।"
" কি আর করি, ক্রন্দনরত তোমার ঠাকুরমাকে, বগলদাবা করে, চল্লাম নবদ্বীপ। গিয়ে তো দেখি ভাই, হুলুস্থুলু কান্ড ! একে তর্কালঙ্কার , তাপ্পরে ব্রহ্মতালু! চারপাশে সব বাগিশ আর ন্যায়রত্নদের ভীড়ে, আমি কোথায় যাই? সবাই মিলে, নিধান দিলেন যে এই মৃত্যু, মহামানবদের হয়। উঁনাকে বাড়ির মধ্যে সমাধিস্থ করা হোক, দাহ করা চলবে না। কিন্তু ঐযে বললাম, আমার শ্যালক মহাশয়টি আরো বড়ো রত্ন। তিনি দেখলেন, যে বাড়ির মধ্যে সমাধি দিলেই আবার খরচ। ওই আরকি, যা হয়, প্রতিদিন ধূপ-ধুনো, ভোগ দাও, হয়তো কিছুদিন পরে লোকে বলবে,একটা সমাধি মন্দির বানাও, তর্কালঙ্কার বলে কথা। অবশেষে, শ্যালক বাবুর, নিধান মেনেই সবাই চল্লাম, নবদ্বীপ শ্মশানে, দাহ করনের জন্য। "
শাশুড়ি যে কখন, সিঙ্গাড়া ভেজে নিয়ে এসেছেন, গল্প শোনার নেশাই, বুঝতেই পারিনি। চমক ভাঙলো শাশুড়ির কথায় - "বাবা, আপনি কিন্তু একটার বেশি খাবেন না। ভিতরে মাংসের পূর আছে।"
"তারপর কি হলো দাদু?" - মাংসের সিঙ্গাড়ায় এক কামড় দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। দেখি কখন তোমাদের বৌদিও এসে বসে পড়েছে, আমার শ্যালিকার পাশে।
"অর্ধেক দিনের বাসি মরা, তারউপর হাজার নিধান-বিধানের গন্ডি পেরিয়ে, পৌঁছাতে পৌঁছাতেই সন্ধ্যে। আর সন্ধ্যে বেলায়, ডোম পাওয়া যে, কত ঝক্কির, সে তুমি তর্কালঙ্কার ই হও বা অন্য কেউ? ঝিল্লি সাজিয়ে, মরা তুলতেই আরো ঘন্টা তিনেক কাবার। পাশের ঝিল্লি তে, আরো একজন পুড়ছে, বিশ্বাস করবি না ভাই, হঠাৎ করে, কোথা থেকে, সে এক খন্ড কালো মেঘ আর তার সাথে পাগলা ঝঞ্ঝা। পাশের ঝিল্লির লোক তখনো জল দেয় নি, আর আমাদেরটা তো শুরুই হয় নি। মিনিট খানেক পরে থেকে শুরু হলো, শিলাবৃষ্টি।"
"ডোমগুলো তো সব, পালালো। আমি আর শালাবাবু বসে আছি। কিন্তু আর সহ্য করা যাচ্ছিলো না। এইবার না গেলে, আমাদের কেও ঝিল্লিতে তোলার লোক খুঁজতে হবে। শালবাবু কে বললাম - দাদা, ডোমেদের আস্তানা তে গিয়ে দাঁড়ায়, নাহলে এইবার আমরাও মারা পড়বো। "
"শিলা বৃষ্টি, থামতেই, পড়ি কি মরি, দিলাম ছুট। ডোমদের আস্তানা থেকে, ঝিল্লিটা মিনিট দুয়েকের পথ হবে। এসে তো থ !! দেখি, আমাদের ঝিল্লি খালি, পাশের টাও , নিভে গিয়েছে, কিন্তু আধ পোড়া শব তখনো ঝিল্লির উপর। রাত্রির অন্ধকারে, শুরু হলো খোঁজা। সেকি সম্ভব ! বৃষ্টির মধ্যেই, চারপাশের, ঝোপ-ঝাড়, জঙ্গল সব তন্ন তন্ন করে খোঁজা হলো।কোথাও পাওয়া গেলো না। মাঝে মধ্যে, ভয় হচ্ছে, শেষে শিয়াল কুকুরে, নিয়ে গেলো নাতো তর্কালঙ্কার মশাইকে ? গোটা রাত্রি খুঁজেও, কোথাও পেলাম না।"
চমকে উঠলাম, দেখি পিঠে তোমাদের বৌদির হাত। অন্য সময় হলে হয়তো, ভালোই লাগতো। সত্যি কথা, গা টা একটু শিরশিরিয়ে উঠছিলো।
"তাহলে, শেষ পর্যন্ত্য আপনার শ্বশুর মশায়ের ডেডবডিটার কি হলো?"
" রহস্য বাবা, সারা জীবনে এর উত্তর খুঁজে পেলাম না। নিজের চোখের সামনে দেখা, অন্য কেউ বললে হয়তো বিশ্বাস করতাম না, কিন্তু নিজের চোখকে অবিশ্বাস করি কি করে? তারপরের দিন থেকে হপ্তা খানেক ধরে , গঙ্গার নীচে পর্যন্ত জাল ফেলে, আশপাশের অনেক দূর পর্যন্ত্য খোঁজা হয়েছিল। তর্কালঙ্কার মশায় আর ধরা দিলেন না। হয়তো গঙ্গা বক্ষে, নিজের সমাধি নিজেই করে নিলেন।"
"এই, তোমরা খাবে না? -- ওহো বৌদি আপনি?" চমকে বলে উঠলো তিয়াশা। বাচ্চা কে ঘুম পাড়িয়ে, কখন এসে জয়েন করেছে,আমরা কেউ খেয়ালও করি নি।
এখনো বৃষ্টি পড়ছে। সত্যি, আনপ্রেডিক্টেবল সিয়াটেল ওয়েদার। আমার গায়ের রোম গুলোও যে কাঁটা দেয় নি, বলবো না। শুধু ভাবছি, এই অবস্থায়, খাওয়ার পর, ঘুমন্ত ছেলে আর আমার চেয়েও বেশি ভয় পাওয়া বৌ কে নিয়ে, পাঁচ মাইলের ড্রাইভ।।।
-----------------------------xxx -------------------------------

Comments
Post a Comment