তন্ত্রধারী
#তন্ত্রধারী
প্রথম ভাগ
"অচিন্ত্যরূপচরিতে সর্বশত্রুবিনাশিনি।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।।"
-------------------------*****-------------------------
ফোনটা ইচ্ছা করেই আজকে সাইলেন্ট মোডে রেখেছিলো, তৃষা। মহালয়ার ভোর, পিতৃপক্ষের শেষ, দেবীপক্ষের শুরু। আর কিছুক্ষন পরেই, মহামায়ার আগমনী ধ্বণিতে মেতে উঠবে, গোটা বিশ্ব। গঙ্গা আর অন্যান্য নদীঘাট গুলো, মুখরিত হয়ে উঠবে, পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ। উত্তরপুরুষের হাতের জলের ছোঁয়ার আশাই, পিপাষিত না দেখা, চেনা মুখগুলো আবার ফিরে যাবে, না ফেরার দেশে। পরবর্তিতে গোটা জাতি মেতে উঠবে, উৎসবের আমেজে।
অনেক বছর ধরেই, এই রাত্রিটা ঘুমাতে পারে না তৃষা। দীর্ঘ এতো দিনের অভ্যেস, জানে আজকেও তার হেরফের হবে না। প্রতি বছরের মতোন, আজও ভোর রাত্রিতে, বাবা ফোন করবে। করবেই করবে, নিজেকে লুকিয়ে রাখার জায়গা খুঁজে পায় না সে। বালিশে মুখ গুঁজে, কান্না গিলে নিতে নিতে আবার ফুঁপিয়ে ওঠে। গোটা রাত্রি তাদের মাস্টার বেডরুমের সিলিঙের এক কোণের দিকে, তাকিয়ে থাকতে থাকতে মন চায়, এই রাত্রি যেনো কখনো ভোরের আলো না নিয়ে আসে। খুব ভালো করেই বোঝে, তার পাশে শুয়ে থাকা মানুষটাও তার মতোন গোটা রাত্রি দু চোখের পাতা এক করতে পারে নি। চোখের কোণ, কোল আর আঁখিপল্লব গুলো একবার করে ভিজে আবার কিছু মুহুর্ত পর অভিমানে শুকিয়ে যায়, আবার পরমুহূর্তে ভিজে ওঠে।
জমে থাকা অভিমান গলার কাছে এসে আটকে থাকে, চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করে, "এই কথাগুলো আর বোলো না বাবা, আমি অন্য কেও নয়, তোমাদের কোনো ক্ষতি করবো না, সে ক্ষমতাও আমার নেই"। চোখ দুটো অকারণে আবার ভিজে ওঠে। ছোটবেলায় ভাই এই বলে রাগাতো, আজকের দিনে, তার ডানদিকের স্বাদন্তটাই নাকি লাল ছোপ থাকে।
রক্তের স্বাদে উদ্ভাসিতা দেবী, শোণিত পাত্র হাতে ধ্বংসের জন্য তৈরি। খড়গহস্তী, শঙ্খিনী, মুন্ডমালিনী রণচন্ডী আলোকদ্যুতিতে ছুটে চলে ধ্বংসের উদ্দেশ্যে। রক্তের বিন্দু স্বাদন্ত হয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পরে তপ্ত পৃথিবীতে, প্রতি বিন্দুতে সৃষ্টি করে আনন্দ, আশা আর সম্ভাবনা। শিকারের নেশায় মত্ত আদম পশুরাজের হিংস্র গর্জনে ছিন্নভিন্ন হয় ধরিত্রী। আচমকাই থমকে দাঁড়ায় রণচন্ডী। কোথাও কোনও প্রণাম মন্ত্রের আহ্বানে, তাঁর বিস্ফারিত নাসারন্ধ্র থেকে বেরিয়ে আসে না পাওয়ার ঘৃণা আর ধ্বংসের অনীহার হুঙ্কার। মাথা ঘুরিয়ে দেখে চন্ডী, এক খর্বকান্তি ব্রাহ্মণ আবক্ষ গঙ্গায়, দুহাত তুলে চোখের জলে আবাহন করে চলেছে তাঁকে।
শান্তি, অপার শান্তি। ব্রাহ্মণের হাতের শান্তির দন্ডী কিছুটা বিচলিত করে তোলে চন্ডীকে। অসহিষ্ণু পশুরাজও অপারগ সেই দন্ডীর সীমানা পেরোতে। তীব্র আক্রোশে সে আঁচড়াতে থাকে ব্রাহ্মণের সর্বাঙ্গ। উত্তাল রণচন্ডী তুলে ধরে তাঁর খড়গ, ব্রাহ্মণের মুন্ডচ্ছেদের উদ্দেশ্যেই, কিন্তু কোথায় যেনো তাঁর হাত আটকে যায়, ব্রাহ্মণের দন্ডীর তন্ত্র আশেপাশে বেঁধে ফেলে তাঁকে। অসীম মহাকাশ মুহূর্তে এসে আশ্রয় নেয়, ব্রাহ্মণের তন্ত্রের জালে। মায়ায় বাঁধা পড়ে যায় স্বয়ং মহামায়া। চারপাশে তখন বিরাজ করে বড় শান্তি।
ওঁ শান্তি, ওঁ শান্তি, ওঁ শান্তি।
মধ্যরাত্রেই উঠে স্নান করে নিয়েছিলো তৃষা। এখন খোলা চুলে, তাদের বারোতলার বারান্দায়, অন্ধকারে দুই হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে। না অপেক্ষার, অপেক্ষায় থাকা কতো কষ্টের, প্রতি বছর এই দিনটা তাকে জানান দিয়ে যায়। অন্ধকারের মধ্যে ও, সে বেশ বুঝতে পারে, প্রতীক এসে কয়েকবার তাকে খেয়াল করে গিয়েছে, কিন্তু হয়তো এই মুহুর্ত টাতে, তাকে বিরক্ত করতে চায়নি। জানে মাত্র আর কিছুক্ষণের অপেক্ষা। দরকার নেই তার এই প্রতি বছর ঢঙ করে দেবী সাজার, এ কিসের অধিকার, যেখানে তাকে শেষের এই নয়দিন লড়তে হবে তার নিজেরই সাথে, প্রতি মুহূর্তে অঙ্গীকার দিতে হবে বাঁচিয়ে রাখার। আর এই সবকিছুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে মিতবাক, ক্ষীণকায়া, ঋজু এক মানুষ। হাতে তার নিজের চেয়েও ক্ষীণকায়া এক নীল অপরাজিতার দন্ড। চোখে যার ইস্পাত শীতল চাহনি আর ওষ্ঠে অস্পুঠ মন্ত্র। যাকে পেরিয়ে, সামনে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব। সম্ভব নয় তার মন্ত্র তন্ত্রের মায়ার জাল কাটানো। পরিষ্কার দেখতে পায় তৃষা, উদ্ধত সেই রণচন্ডী ও ধীরে ধীরে শান্ত হয়, সেই লৌহশলাকা অপরাজিতার কাছে। পশুরাজের আক্রোশ আর তাঁর অভিমানী দম্ভে বিভক্ত হয়ে পড়ে জলস্থল, গর্জে ওঠে আকাশ।
লিভিং রুমের ল্যান্ডফোনটা বেজে উঠে, ভোর রাতের নিস্তব্ধতাকে চিড়ে। প্রতীকের মৃদুস্বরে হ্যালোর, অন্যদিকে যে বড়মার গলা, সেটা চোখ বন্ধ করেও বুঝতে পারে তৃষা। ফোনটা স্পিকার মোডে রেখে, বারান্দায় এক কোণে এসে দাঁড়ায় প্রতীক।
"ভামী, মানুষটা যে দাঁড়িয়ে আছে মা, অনুমতি না পেলে সেই বা যায় কি করে?" স্পিকার ফোনে ভেসে আসে বড়মার গলা। ছোটো থেকেই, তৃষাকে ভালোবেসে ভামী নামে সম্বোধন করেন, দশদিক আগলে রাখে যে, সেইতো দশভূজা ভামীকা।
দুই চোখের জল, ডান হাতের পিছনে মুছে, ঘরের ভিতরে এগিয়ে আসে তৃষা। মনের মধ্যে অপার সাহসে ভর করে, ভাবে বলেই দেবে এক সুযোগে, যাও দিলাম তোমাকে অনুমতি। যতো ফোনের কাছাকাছি আসে, তার পা যেনো স্থবির হতে থাকে, পিছন ফিরে একবার আকুল দৃষ্টিতে দেখে প্রতীক কে। বারান্দা থেকে ঘরের ভিতরের, এই দশ পাও যেনো শেষ হতে চায় না। অনেক চেষ্টা করেও, শেষ পর্যন্ত নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না তৃষা। বাঁ হাত দিয়ে নিজের মুখ প্রাণপণে চেপে ধরে, ডান হাত মাটিতে রেখে মাথা নামিয়ে আকুল কান্নায় ভেঙে পড়ে। তার ঘোর কৃষ্ণবর্ণ চুল ঢেকে দেয়, স্পিকার ফোনের কন্ঠকে। মুখ দিয়ে শুধুমাত্র তার অস্পুঠ, অভিমানী গোঙ্গানী বেরিয়ে আসে।
"আর দেরী করো না, ঠাকুরপো, তন্ত্র ধারণের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। দিলো তো, মেয়েটা অনুমতি"।
ছলছল চোখে উঠে দাঁড়ায় ব্রাহ্মণ, অনিচ্ছায় তুলে নেয় পাশে রাখা তার সুনিপুণ তন্ত্র। ঝলসিয়ে উঠে, সেই ইস্পাত কঠিন অপরাজিতা। বাঁধা পড়ে যায় মহামায়া, ব্রাহ্মণের স্নেহের মায়ায়। আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় প্রতীক। এখনও ফুঁপিয়ে চলেছে তৃষা। অভিমান কাটিয়ে, মনের উপর চেপে থাকে দুঃখ। জানে সেটাও কেটে যাবে আস্তে আস্তে, এ তো আজকের নয়, প্রতি বছরেরই নিয়ম। এটা যে তার বংশের পরম্পরা, সে যে অংশ, সেই নিয়মেরই। যেখানে তার প্রতি পদক্ষেপ, হিসাব নেবে তার বংশের সুরক্ষায়।
ধীর পায়ে, গঙ্গার দিকে এগিয়ে চলে। তন্ত্র ধারণের সময় সমাগত। এই কয়েকদিন আর কথা বলার ও নিয়ম নেই, এমনিতেই সে মিতবাক। বড় কঠিন লাগে এই সময়। আবক্ষ গঙ্গার জলে দাঁড়িয়ে, তন্ত্র মাথায় ঠেকিয়ে, চোখ বন্ধ করে আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকায় সে। বয়স ধীরে ধীরে মনের উপর ভারী হয়ে উঠছে, অস্পুঠ কন্ঠে মিনতি জানায়, কেউ তো কখনো আসবে কোনোদিন, তার এই তন্ত্রের ভার নিতে। অন্য কোনও তন্ত্রধারী।
স্তব্ধ হয়ে থাকে চন্ডী। দশদিকে বাঁধা পড়ে আছে তন্ত্রের মায়ায়। উত্তাল ক্রোধ ধীরে ধীরে প্রশমিত হয়ে, জন্ম নেয় স্নেহ আর মায়া। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় চন্ডী, বাঁচিয়ে রাখার অঙ্গীকারে ব্রাহ্মণ আর তার পরিবারকে। সে যে মায়া, বড় কঠিন মায়া, দুই তরফেরই। অস্পুঠ স্ত্রোত্র স্ফুট হয়, ব্রাহ্মণের কন্ঠে,
"প্রসীদ্ দেবী, প্রসীদ্ চন্ডী, মুন্ডমালিনী"।।
-------------------------*****-------------------------
দ্বিতীয় ভাগ
"বন্দিতাঙ্ঘ্রিযুগে দেবী সর্বসৌভাগ্যদায়িনী।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।।"
-------------------------*****-------------------------
আজকে পঞ্চমী। ভোরবেলায় ভাইয়ের ফোন এসেছিল ম্যানচেস্টার থেকে। ওরা আজকে প্লেনে চাপবে, প্রায় এগারো ঘণ্টার লম্বা যাত্রা। মুম্বই পৌঁছাতে পৌঁছাতে ষষ্ঠির সকাল। ষষ্ঠির দিনটা একটু বিশ্রাম নিয়ে, জেটল্যাগ কাটতে না কাটতেই, সপ্তমীর ভোরের প্লেনে সবাই মিলে কলকাতা। কলকাতা এয়ারপোর্টে প্রতীকের খুড়তুতো ভাই গাড়ি নিয়ে আসবে, তাদেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ওইখান থেকে সড়ক পথে তৃষাদের গ্রামের বাড়ি। দূরত্ব অনেকটাই, রাত্রি পর্যন্ত হয়তো পৌঁছে যাবে। এতটা রাস্তা, ধকলতো একটু থাকবেই। চিন্তা শুধু বাচ্চা গুলোকে নিয়ে। বিশেষ করে ভাইয়ের মেয়েটা। সবে মাত্র তিন বছর বয়স। আগেরবার গোটা রাস্তা বমি করতে করতে গিয়েছিলো। নিজের ছেলেটা একটু বড়, তবুও একটা চিন্তা থাকেই। এই কয়েকটা দিন কোনো কিছু থেকেই নিজের নজর একটুও সরাতে পারে না তৃষা। বেশির ভাগ সময় চুপচাপ থাকে, মাঝেমধ্যে স্বভাববিরুদ্ধ একটু উত্তেজিত ও হয়ে পড়ে। তবুও সর্বদা সজাগ থাকতে চেষ্টা করে। অকারণে যেনো একটু বেশিই সচেতন। কেনো জানে না, কিছুতেই দুই চোখের পাতা এক করতে পারে না। হয়তো বা অদৃশ্য কেউ তাকে করতেও দেয় না।
বাথরুমের আয়নায়, শাড়ির প্লিটটা পিন করতে গিয়ে কোথাও যেনো হারিয়ে গিয়েছিল সে। উপরের ঠোঁট তুলে, আয়নায় বারবার দেখছিল, তার ডানদিকের স্বাদন্তটা।
- "দিদি..দিদি...ও দিদি। কি হয়েছে তোমার?"
- "না, কিছু না। "
ঘোর ভেঙে বেরিয়ে আসে তৃষা। কে যেনো ছেড়ে দিয়ে যায় তাকে, আবার বর্তমানের হাতে।
মুখ তুলে, আয়নায় দেখে, সবসময়ের জন্যে রাখা রান্নার মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে, বেডরুমের দরজার কাছে। বাথরুমের দরজাটা লাগাতে আজ ভুলে গিয়েছিল সে। শাড়ির আঁচল ঠিক করতে, কতটা সময় অন্যমনস্ক ছিলো সেটা ঠিক বুঝতে পারে নি।
- "ইলিশ মাছটা আজকে রাত্রে রান্না করি। কাল সকালে তো ভাই রা আসছে।"
- "না, আজকে পঞ্চমী। অষ্টমী পর্যন্ত আমরা নিরামিষ খাই। আর ওরাও তাই খাবে। হসপিটাল থেকে ফেরার পথে, আমি এগলেস মাফিনস্ আর প্যাস্ট্রি নিয়ে আসবো।"
- "দিদি, জার্মান বেকারী থেকে নিয়ে এসো। মনে আছে, আগেরবার ভাই তোমার প্লেটের পাফ টাও খেয়ে নিয়েছিলো।"
বৈশিষ্ট্যিক দম্ভে, ডানদিকের উপরের ওষ্ঠ মৃদু তুলে, ওয়ার্ড ড্রোবের কাছে এগিয়ে আসে তৃষা, হ্যাঙ্গারে ঝোলানো তার অ্যাপ্রন টা নিতে। পরম মমতায় একবার হাত বুলিয়ে দেয়, বুকের কাছে সাদার উপরে, নীল হরফে লেখা তার নাম, ডঃ. তৃষা মজুমদার, অবসটেট্রিকস আর গাইনোকোলোজি। প্রতীক অবশ্য আগেই বেরিয়ে গিয়েছে। ওর হসপিটালটা পাওয়াই এর কাছে আর তৃষার টা ভাসি তে। দুজনকে যেতে হয় পুরো উল্টো দিকে, তাদের ফ্ল্যাট বাড়ি থেকে।
- "দিদি, তোমার ওটসের খিচুড়ি, ভরে দিয়েছি। মনে করে, গরম করে নিয়ো।"
আগামীকাল থেকে ছুটিতে থাকবে তারা। বছরের এই পাঁচটি দিন, কোনও কাজে মন বসাতে পারেনা। কালকে ভোরবেলায় এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে হবে, আড়াইটের এতিহাদ, যদিও বেশির ভাগ সময়, আগেই পৌঁছে দেয়। তবুও ইমিগ্রেশন শেষ করে বাইরে বেরোতে ঘন্টা দুয়েক। ভাইয়ের মেয়েটা ছোটো দু হাত বাড়িয়ে ছুটে আসে, দুধের দাঁতের মিষ্টি হাসি হেসে গলা জড়িয়ে ধরবে। আধো আধো ভাষায়, পিম্মি পিম্মি বলে ডাকে। চিন্তায় থাকে তৃষা, বাচ্চাটার যেনো কোনও স্বাদন্ত না আসে। এই অভিশাপের ভার, আর এগিয়ে দিতে চাই না, পরবর্তীতে। অতো সকালে কালকে, ড্রাইভারকে আসতে বারণ করে দিয়েছে, প্রতীক নিজেই সবাইকে ড্রাইভ করে নিয়ে আসবে। ভোরের মুম্বই, ধোঁয়াশাই মাখা একটা আলাদা রকমের অস্বাভাবিক, রোমাঞ্চকর শান্তিময়।
লাঞ্চবক্স আর ব্যাগ টা নিয়ে, লিফ্ট থেকে বেরিয়ে আসে তৃষা। ড্রাইভার ছেলেটা এগিয়ে এসে জিনিষ গুলো হাতে নিয়ে গাড়িতে তুলে দেয়। পিছনের সিটে বসতে গিয়ে, আরও একবার সিটবেল্ট গুলো ভালো করে পরীক্ষা করে নেই। ভাইয়ের মেয়েটা এখনও চাইল্ড সিট ব্যবহার করে। পিছনের মাঝখানের ডানদিকের লকটা আর ব্যাকসিটের এসি ভেন্টগুলো ভালো ভাবে বন্ধ করে খুলে দেখে।
- "ম্যাডাম, আজ আপ একদম্ পিছে বৈঠেঙ্গে?"
ড্রাইভার ছেলেটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে তৃষাকে। সেভেন সিটারের, একদম পিছনের সারির, মাঝের সিটে বসে আছে সে, সিটবেল্ট বেঁধে। চোখে তার মরা মাছের দৃষ্টি।
আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে তাকে তন্ত্রের মায়া। জানে যতো সে ছাড়ানোর চেষ্টা করবে, ততোই চেপে বসবে সেই অপরাজিতা গ্রন্থি। তার মনের ত্বকে, আরও গভীরে বিঁধতে থাকবে, সেই ইস্পাত কঠিন অপরাজিতা, একটু একটু করে শেষে পুরোপুরি গেঁথে ফেলবে সেই অসহনীয় তন্ত্র। আর দূরে দাঁড়িয়ে শুধুমাত্র তা দেখবে এক খর্বকায়া তন্ত্রধারী। চোখে ক্ষমার অশ্রু, ওষ্ঠে অস্পুঠ স্ত্রোত্র।
- "পৌঁছে গিয়েছি।" মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে আসে প্রতীকের মেসেজ। জানে এই সময়টায় ছোটো খাটো বিষয়েও অহেতুক চিন্তা করে তৃষা।
চিন্তা আরও একজনের জন্য থাকে তৃষার। তার মা। পুজোর দিন গুলোতে, মায়ের অসুখটা একটু বাড়ে। ভাই কে দেখে খুব খুশি হয় এবং বেশি পরিমাণে প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পরে। সব কিছু থেকেই, ভাই কে আগলে রাখতে চেষ্টা করে। ভাবে সর্বদা কেউ যেনো শুধুমাত্র, তার সন্তানের ক্ষতিই করতে চায়। যা কিছু আসে তার সন্তানের সম্মুখে, সব কিছুকেই দুই হাতে আপ্রাণে সরিয়ে দেয়। আর যখন তা পারে না, তখনই হয়ে উঠে হিংস্র, হারিয়ে ফেলে ভাষার শালীনতা। কখনও কখনও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠে দেবী প্রতিমার প্রতিও। ছোটো থেকেই দেখে আসছে তৃষা, অষ্টমীতে মা যেনো কিছুতেই মানতে পারে না, ঠাকুর দালানের ওই মূর্তিকে। তীব্র আক্রোশে গাল মন্দ পারে, মৃন্ময়ী সেই মেয়ের উদ্দেশ্যে। বছরে একবার ছেলে মেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি আসা, তাও যেনো তার মায়ের আজকের দিনে সহ্য হয় না। গোটা গ্রাম আর আশপাশের মফস্বল ভেঙে লোকজন আসে, অষ্টমীর সকালের এই ননদ ভাজের কলহ দেখার জন্য। বছরের পর বছর, আজকের দিনে দেখে এসেছে তার জন্মদাত্রী মা, খোলা চুলে ঠাকুর মন্দিরের সামনে গোল হয়ে ঘুরে, অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করে চলেছে মন্দিরের দুর্গা প্রতিমা কে। লোকজন চারপাশ থেকে উলু দিচ্ছে, কেউ কেউ নতজানু হয়ে এক গোছা জ্বালানো ধূপ, মালশা ভরা গনগনে ধূনো দিয়ে আরতি করছে, যতো ঢাকের বোল বাড়ে, মা যেনো ততো অসহিষ্ণু হয়ে উঠে। ক্রমশ খারাপ হয় মুখের ভাষা, মানুষ জন ততো উদ্বেলিত হয়ে পড়ে। চোখের জলে, কতো প্রার্থনা আর করুণ মিনতি এইদিকে ওদিকে গড়াগড়ি যায়। মায়ের সেদিকে কোনও ভ্রুক্ষেপ থাকে না। তার অসহায় মা, শাপশাপান্ত করেই চলে। অভিমানে থুথু ছেটায় প্রতিমার দিকে, সন্দেহের চোখে দেখে আশেপাশের সবাই কে। ভাই কে, ক্ষণিকের জন্যও কাছ ছাড়া করতে চায় না মা। একরত্তি বাচ্চাটাকেও দুদ্দুর করে তাড়িয়ে দেয় ভাইয়ের কাছ থেকে। যেনো এক অদৃশ্য সংগ্রাম চলে মায়ের, শ্বশুর ঘরের সেই মেয়ের সাথে। যা কিছু তার নিজের, শুধু সেটুকুই আঁকড়ে থাকা।
আজকের দিনে, চিন্তে পারে না তৃষা, তার সেই অস্বাভাবিক মা কে। কেন ঘৃণায় তাড়িয়ে দিতে চায়, তাকে তাঁর চোখের সামনে থেকে। প্রতি মুহুর্তে মনে করিয়ে দেয়, সে আলাদা, এই বংশের অভিশাপ বহন করে চলেছে। অথচ ছোটবেলায় সেই মাকেই দেখেছে,মাঝ রাত্রিতে ঘুমন্ত ভাইকে কোলে নিয়ে, ঠাকুরের সামনে শুইয়ে রেখে আকুল নয়নে কাঁদতে।
তীব্র অভিমান আর ক্রোধে আবার ফুঁসতে থাকে চন্ডী। পায়ের নিচে বসে আছে পশুরাজ। নীচে নামানো,খড়গ আবার তুলে নেই হাতে, তন্ত্রের মায়াজাল কে কাটার উদ্দেশ্যে। চোখে ঘৃণার চাহনি, অপেক্ষায় থাকে কোনও এক মুহুর্তের যখনই তন্ত্রধারী হবে একটু অবচেতন। সেই সময়েই পেরোতে হবে এই মায়াজাল। কিন্তু অতন্দ্র প্রহরী তন্ত্রধারী ও সদা জাগ্রত, দৃঢ় মুষ্ঠীতে ধরে আছে সে গ্রন্থীসম অপরাজিতা। অধৈর্য্য হয়ে পড়ে চন্ডী, আর মাত্র একটি দিন। নবমী দ্বিপ্রহরের মধ্যেই চাই, তার ভর্তি শোণিত পাত্র, খড়গে চাই রক্তের চিহ্ন।
গ্রামের বাড়ি পৌঁছাতে প্রায় সপ্তমীর রাত্রি নটা। এইদিকের রাস্তা গুলো এখনও এতো খারাপ, ভাবা যায়না। বাড়ির দরজার সামনে থেকে একটু এগিয়ে পার্কিং করা গাড়িটা থেকে ব্যাগ পত্র গুলো নামানোর তদারকি করছিলো তৃষা। বড়মা আগেই দরজার সামনে, এক মুখ হাসি নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। ছেলে,মেয়ে গুলোকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে, ঘরে নিয়ে তোলে। ভাইয়ের বউকে, কোমর জড়িয়ে ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে হেসে বলে,
- "কিরে মুখপুড়ি, বিলেতে থেকে আরও শাঁওলা হয়েছিস কেনে?"
প্রতীক কে দেখে, এখনও মাথায় ঘোমটা দেয় বড়মা। ব্যাগ গুলো গাড়ির পিছনের অংশ থেকে নামানোর মাঝেই, ডানদিকের গালে অদ্ভূত এক উষ্ণতার স্বাদ পায় তৃষা।
- "আহঃ বড়মা, একমুখ ধুলো। দিলে তো এর মধ্যে চেটে।"
- "হোক গা ধুলো, কাল পাব নাকি জানি না বাবা। আমি আমার মহাপ্রসাদ আজকেই খেয়ে নিলাম। "
ঘুরে দাঁড়িয়ে, দুই হাতে জড়িয়ে ধরে তৃষা। বলে,
- "দাঁড়াও, আগে তোমাকে প্রণাম টা সারি। "
- "ছিঃ ছিঃ, আটনে বট্ঠান আছে যে। তোদের নিজের বাড়ির মেয়ে। আমি তো পরের বাড়ির, ধড়ে আমার কটা মাথা যে, তাঁর সামনে তোমাদের কাছে পেন্নাম নি?"
- "ছাড়ো তো, তোমার শুধু মজা করার স্বভাব।"
জড়িয়ে ধরে, মাথার চুলে হাত বুলিয়ে, কপালের মাঝখানে মস্ত বড়ো সিঁদুরের টিপটা ঠিক করে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করে,
-" ভালো আছো তুমি বড়মা? মা কেমন আছে আর বাবা?"
- "সবাই ভালো, যা এবার গিয়ে আচ্ছা করে গা হাত পা ধুয়ে নে।"
জ্যেঠুকে কোনও দিন দেখেনি তৃষা। তার জন্মের আগে থেকেই, জ্যেঠু নিরুদ্দেশ। কিন্তু দাদু কোনোদিন চায় নি, বড়মা বৈধব্য ধারণ করুক। তাই আজ এতো বছর পরেও বড়মা, অপেক্ষায় থাকে। বড় নিষ্ঠুর এই সম্পর্ক।
মনে হয় যেনো, আজ এক বছর পরে শান্তির স্নান করলো তৃষা। বাথরুম থেকে বেরিয়ে, শুনলো সবাই ইতিমধ্যে মন্দিরে সামনে চলে গিয়েছে। পায়ের চটি টা, একপাশে খুলে রেখে মন্দিরের নিচে এসে দাঁড়ায় তৃষা। সপ্তমীর সন্ধ্যা আরতি অনেকক্ষণ হলো শেষ, বাইরের লোহার দরজা টাও বন্ধ। লোহার গেটের সামনে, মন্দিরের সিঁড়ির উপর তার মা বসে আছে, ভাই কে জড়িয়ে ধরে। ভাইয়ের মাথাটা মায়ের কাঁধের উপর। ভাইয়ের বউ আর বাচ্চা মেয়েটা আর তার ছেলে একপাশে, প্রতীক কিছুটা পিছনে তাদের, সাথে হাতেগোনা আরও কয়েক আত্মীয়স্বজন। মা এখনও ভাবে, ভাই সেই ছোটোটিই আছে। পরম স্নেহে ভাইয়ের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে, চিনিয়ে দিতে থাকে সব ছেলে মেয়েদের কে। কিন্তু নিজে চিনতে পারে না, তার নিজের অংশজ দের। এগিয়ে এসে, মায়ের অন্য কাঁধে হাত রাখে তৃষা। মুখ ঘুরিয়ে তার মুখের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে। চুলের নিচের অংশ অনেক বছর ধরেই জটের ভারে শক্ত। ক্ষণিকের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দুজনে একে অপরের প্রতি। তারপর সাপের মতোন নিঃশব্দে হিসহিসিয়ে উঠে,
- "দূর হ, দূর হ। রক্তখাকি, বাপ সোহাগী বেটী।" ভাইকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে ওঠে মা।
-"দেবো না, কিছুতেই নিয়ে যেতে দেবো না।"
বাঁ হাতের পিছনে নাকের ডগা মুছে নিয়ে, উল্কার গতিতে ফিরে চলে তৃষা। তীক্ষ্ণতায় ছিনিয়ে নেই, ভাইয়ের মেয়েটার হাত। শক্ত হাতে টানতে টানতে নিয়ে চলে তাকেও। দেবে না একে, কিছুতেই এদের হাতে তুলে। তার আগে ভেঙে চুরমার করে দেবে সে, সেই তন্ত্র।
প্রস্তুত...লড়াইয়ের ক্ষেত্র, প্রস্তুত দুপক্ষই। শানিয়ে নেই নিজের নিজের অস্ত্র। অপেক্ষা শুধু মুহূর্তের। তীব্র গর্জনে ঝাঁপিয়ে পড়ে পশুরাজ, তন্ত্রের মায়াজালের উপর। পাশবিক আক্রোশে ছিন্নভিন্ন করতে চায়।
দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলে তৃষা। হাতে শক্ত করে ধরা বাচ্চাটার হাত। ব্যাথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে সে, অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তার এই অচেনা পিম্মির দিকে।
- "আর এক পা নয়, ভামী। তিষ্ঠ।" ইস্পাত শীতল শলাকাসম তন্ত্র নিঃশব্দে নির্দেশ দিয়ে যায় তাকে। স্থবির তৃষার স্বাদন্ত বেয়ে নেমে আসে নোনা স্বাদ। সে রক্ত না অশ্রুর বোঝা বড় দায়।
আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকায় সে। চিরস্থায়ী জ্যোতিষ্কলোকের মাঝে, দেখে অপার দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে তার বাবা, তন্ত্রধারী।
"তিষ্ঠ দেবী, তিষ্ঠ চন্ডী, মুন্ডমালিনী"
-------------------------*****-------------------------
[ক্রমশঃ]
Comments
Post a Comment