গোবরের ভূত দেখা

#গোবরের ভূত দেখা 


মানুষের ছেলের নাম যে গোবর হতে পারে, জলপাইগুড়ি না গেলে, অনেক নতুন, নতুন পদার্থের মতোন, এটিও জানতে পেতুম না। 

        সময় টা দু হাজার সালের, ফেব্রুয়ারি, মার্চ মাস হবে । সবে নতুন বছরে, সিনিয়র দাদাদের অসীম ভালোবাসা থেকে একটু ধাতস্থ হয়ে, হস্টেলে সব জাঁকিয়ে বসেছি । গোটা স্কুল, ফার্স্ট কিম্বা সেকেন্ড বেঞ্চে কাটানো জীবনের বাইরে, প্রথম বারের মতোন ব্যাক উইংসের গোপনীয়তা, আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকা অতল রহস্য একটু একটু করে উপভোগ করতে শুরু করেছি। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের হস্টেল এবং মেসের খাবার ও যে কতো দিলখুশ হয়, তারও নিত্যনতুন সন্ধান পাচ্ছি। মোদ্দা কথা, পড়াশোনা আর পড়াশোনা করতে বলার লোকজন কাছে পিঠে না থাকলে, জীবন যে কতো রঙিন আর আনন্দের হয়, তা বলে বোঝানোর দরকার নেই। 


কোথাও কোনও চাপ নেই, আট টায় ঘুম থেকে উঠে, চা পরোটা ডাল আর এগ ভুরজি খেয়ে, সাইকেল নিয়ে কলেজ, দুপুর একটায় হস্টেলে ফিরে লাঞ্চ, তারপর উইংসে গ্যাঁজ, সেকেন্ড হাফ যেতে ইচ্ছে করলে যাও, নাহলে অন্য কেউ প্রক্সি। বিকেলে কলেজ মোড়ে মুড়ি, ঘুগনি, আলুর চপ আর চা দিয়ে আড্ডা। সন্ধ্যা রাত্রে হস্টেলে ফিরে, কমনরুমে টিটি বা ক্যারাম, তারপরে মেসের খাবার খেয়ে,  উইংসে এসে পাঁচ দানের আসর, মানে টোয়েন্টি-নাইন। 


উনিশ বছরের প্রাণ টা, প্রথমবারের মতো, সবে মাত্র একটু আরামের জিন্দেগি দেখতে শুরু করেছে, তাও ভগবানের সহ্য হলো না। 


            রাত্রে পাঁচ দানের আসরে, উইংস মনিটর সুদীপ ঘোষণা করলো, পরের মাস থেকে, এক মাস ধরে মেসের দায়িত্ব আমাদের, মানে "ব্যাক উইংস বাল(ক)" দের। অন্য কারুর কথা জানি না, তবে আমার সংসার চালানোর অভিজ্ঞতা এর আগে বলতে, বাবার নাইট শিফট থাকলে কোনও কোনও দিন, বিধাননগর বাজার থেকে কিছু সব্জি আনা, মাছ কেনানোর ভরসা বাবা কিংবা মা কেউই আমার উপর সেইরকম ভাবে কোনোদিন দেখাতে পারে নি, কাজের লোক না আসলে মা বাসন ধুয়ে রাখলে, জল ঝড়িয়ে তাকে তুলে রাখা, খাবার জলের বোতলে জল আর বিছানা পাততে বাবা কে সাহায্য করা। তাই বলে, পুরো একটা মাসের দুই বেলার মেস চালানো, তাও একশো তিরিশ জন দামড়ার খোরাকি। এক সব্জি পরপর দুদিন হলে চলবে না, সোম, বুধ, শুক্র বাবুদের রাত্রে মুরগি বাঁধা, বাকি চারদিন দিনে পোনা, রাতে ডিম্ব। মাস শেষে একটি আই. ডি মানে ইমপ্রুভড ডিনার, সব মিলিয়ে মাসের মেস বিল যেনো সাড়ে চারশো না ছাড়ায় । 

                 থাক তোর পাঁচদান, শেষে এই...এক মাস...মেসের লগবুক হিসাবের চেয়ে, টিমোসেঙ্কো বোঝা অনেক সোজা।


পরের দিন, বিকেলে কলেজ মোড়ের প্রোগ্রাম বাতিল, উইংস মনিটর সুদীপের নেতৃত্ব, মেস কমিটি গঠন হলো। পনেরো জনের উইংসে, সবচেয়ে অলস ব্যক্তি, শ্রীমান মণ্ডল হলেন, মেস ক্যাপ্টেন। আসল নাম অসীম মণ্ডল, ভাইস ক্যাপ্টেন আমি আর গোবর। দুজনই বলপূর্বক নির্বাচিত । 


             গোবর ছিলো আমাদের ব্যাক উইংসের, শুঁয়োপোকার মধ্যে প্রজাপতি,  উচ্চিংড়ে কলোনীর ভিতর গঙ্গাফড়িঙ । ভগবানের ঘরে যতো ড্রাম আলকাতরা ছিলো সব মনে হয় ওর বহিরাঙ্গে ঢেলে দিয়েছিল, তাই মনের ভিতর ঢালার মতোন আর কিছু  অবশিষ্ট ছিলো না। মানুষ ও কতো ভালো আর সাধারণ মনের হতে পারে, গোবর ছিলো ঠিক সেইরকম। কোনও এক দাদা, বছর শুরুতে, ওর বহিরাঙ্গের ঘোর কৃষ্ণবর্ণ দেখে মন্দবেসে নাম দিয়েছিলো গোবর । কলেজের খাতায় নাম থাকা হীরক, তাই চার বছর সবার কাছে মন ভোলানো গোবর হয়েই ছিলো। 


          যাই হোক, এক অলস ক্যাপ্টেন, দুই ভাইস ক্যাপ্টেন আর বারোজন উইঙ্গারস নিয়ে আমাদের মেস যাত্রা শুরু হলো। খুব যে খারাপ চালিয়ে ছিলাম, তাও বলবো না, মাসের মধ্যে দুবার লুচি, কাজু দিয়ে ছোলার ডাল ও খাইয়ে ছিলাম। তবে গোল বাঁধলো আই. ডি র দিনে।


আই.ডি র দিনে একটা বেশ ঝাক মক ব্যাপার থাকে, একটা বেশ বরকর্তা, বরকর্তা ভাব। ইমপ্রুভড ডিনার বলে কথা, গোটা মাসের হাড় ভাঙা পরিশ্রমের শেষে, পাওনা বলতে প্রথম ব্যাচে খাওয়ার সুযোগ...এইটুকুই ব্যাস, কিন্তু উনিশ বছরের প্রাণে সেটাই বা কম কি? যা বাবা, মা শেখাতে পারেনি, একমাসের ভাইস ক্যাপ্টেনসি কিছুটা হলেও, শুরু তো করেছিলো। 


              আই. ডি র রাত্রে, ফ্রাইড রাইস আর চিলি চিকেন বানানোর জন্য রাসেল  দা কে ভাড়া করে নিয়ে এসেছিলাম। বেগুনটাড়ি মোড়ে, একটা ছোটো বিরিয়ানি, চিলি চিকেনের দোকান ছিল। সব কিছু ঠিকঠাক এগোচ্ছিলো, কিন্তু বাধ সাধলো বৃষ্টি। সন্ধে থেকে টিপ টিপ করে পড়েই চলেছিল, এর মাঝেই আমি আর গোবর রান্নাঘর সামলাচ্ছিলাম, রাসেল দার সহকারী হয়ে।  একটা দুটো চিলি চিকেন যে তুলে খাইনি, সেটা বলতে পারবো না।  


              আমরা যারা একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে কলেজে পড়েছি, তাদের কাছে যোগাযোগ বলতে ছিলো, সপ্তাহের একদিন পাবলিক ফোন বুথ থেকে বাড়িতে কথা বলা।  তাও বুথে বলা থাকতো, ফোন আসলে  হস্টেল আর রুম নাম্বার দিয়ে যেনো ডেকে পাঠায়। ফ্রাইড রাইস সবে উনুনে বসেছে, গোবরের ডাক পড়ে চিরকুটে, কলেজ মোড়ের ফোন বুথে ওর বাবা ফোন করেছেন। গোবর ছোটে, সাইকেল নিয়ে, বলে "দশ মিনিট দে, একটু ম্যানেজ কর রাসেল দার সাথে, আমি বাড়িতে ফোন টা করেই আসছি"। 


              বৃষ্টির জোড় বাড়তেই থাকে, উত্তরবঙ্গের আবহাওয়া খুব নিষ্ঠুর প্রকৃতির। নিভে যাওয়া আলোয় উজ্জ্বল উনুনের আগুনে, রাসেল দার ফ্রাইড রাইস প্রায় হওয়ার মুখে। উইংস মনিটর, মেস ক্যাপ্টেন সহ, গোটা উইংস যুদ্ধ জয়ের আনন্দে মেসের মধ্যে। জীবনের প্রথম রেসপনসিবিলিটি, উতরে যাওয়ার খুশি সবারই চোখে মুখে।  কিন্তু প্রায় কুড়ি মিনিট অতিক্রান্ত, ফার্স্ট ব্যাচ বসার জন্য তৈরি, কিন্তু আমার ভাইস ক্যাপ্টেন যে এখনও মিসিং। আমি চিৎকার করে বলি, "সুদীপ, গোবর যে এখনও  ফোন করে ফেরেনি, দশ মিনিট বলেছিলো"।


            ছিটকে উঠে পড়ে সুদীপ, আমার দিকে তাকিয়ে বলে "তুই এক খানা বড় বাল(ক), হ্যাঁ করে দাঁড়িয়ে  দেখছিস কি। চল, বেরো সব সাইকেল নিয়ে"।

        

                সেই আমার প্রথম ঝুম বৃষ্টিতে, কোনও ছাতা বা রেইনকোট ছাড়া সাইকেল চালানো। গোবর কে খুঁজে পায়, মাল্টিজিমের কাছে মাঠের মধ্যে মুখ গুঁজে পড়ে, গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে, সাইকেল টাও কাদাতে।


              তিন দিন ভর্তি ছিলো, জলপাইগুড়ি সদরে। সেই রাত্রে যখন গোবর কে নিয়ে সদর হাসপাতালে যায়, ডিউটি ডক্টর জিজ্ঞেস করেছিলেন, কোন হস্টেল? দুই নম্বর হস্টেল বলাতে, হেসে   বলেন নেশা কেস না মারপিট? কি করে বোঝায় স্যার, জীবনের প্রথম অর্জিত আই. ডি ফেলে এসেছি, মেস রুমের টেবিলে।


          হায়রে গোবর, ফ্রাইড রাইস, চিলি চিকেন ছেড়ে, গাঁজা টেনে ছিলিস? মন ভালো করা হাসি নিয়ে গোবরের উত্তর ছিলো, "বিশ্বাস কর, আমাকে না কে পুরো রাস্তাটা ফলো করছিলো, জিমের কাছে এসে সাহস হওয়াতে পিছনে তাকায়, দেখি সাইকেলের  ক্যারিয়ারে সাদা কাপড়ে মুখ ঢেখে, বসে আছে। আর পারি নি, ওইখানেই পড়ে গিয়েছিলাম, তবে তোরা আমার জীবন বাঁচিয়েছিস। শুধু শুধু আমার জন্যে, আই. ডি টা কেঁচে গেলো " ।


                   "পাবলিক, দেখতে পেলে নাকি?" পরের একমাস জিমের মাঠে মাঝ রাত পর্যন্ত, এইদিক ওদিক টর্চের আলো। যদি একবারও গোবরের ভূতনীর দেখা মেলে। ।

Comments

Popular posts from this blog

শনিবারের কাহিনী

তন্ত্রধারী

অন্যভাবে